CS, SA, RS, BS, BRS খতিয়ানের পার্থক্য
Eklas টিম · প্রকাশ ১৫ অক্টোবর ২০২৬ · হালনাগাদ ১৫ অক্টোবর ২০২৬
একই জমির জন্য পাঁচ রকম খতিয়ানের নাম শুনলে মনে হয় কেউ গুলিয়ে ফেলছে। আসলে গুলিয়ে ফেলেননি। বাংলাদেশের জমি একবার মাপা হয়নি। সিএস, এসএ, আরএস, বিএস আর বিআরএস আলাদা জরিপ। প্রতিটি জরিপে মৌজার খতিয়ান নতুন করে লেখা হয়েছে, দাগ নম্বর নতুন হতে পারে, জেএল নম্বরও বদলাতে পারে। CS SA RS khatian বলতে তাই এক বইয়ের তিন অধ্যায় নয়। তিনটি আলাদা খাতা, আলাদা সময়ে, আলাদা নিয়মে।
এই পার্থক্য না বুঝলে আপনি আরএস দলিল নিয়ে সিএস খতিয়ান খুলবেন, নাম না পেয়ে ভাববেন জমি নকল। অথবা সিএস-এ দাদার নাম দেখে ভাববেন এখনো দাদাই মালিক। দুটোই ভুল। জরিপ সময়ের ছবি। সময় বদলালে ছবি বদলায়। কোন ছবি কোন কাজের, সেটাই এই গাইডের বিষয়।
পাঁচটি জরিপ এক লাইনে
সিএস সবচেয়ে পুরনো বড় জরিপ। এসএ তার পরের, রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণের সময়কার। আরএস আরও পরের রিভিশন, অনেক জেলায় এটাই দলিলে সবচেয়ে বেশি উল্লেখ হয়। বিএস কিছু এলাকায় বাংলাদেশ আমলের জরিপ। বিআরএস তারও পরের রিভিশন, যেসব মৌজায় কাজ শেষ হয়েছে সেখানেই পাওয়া যায়। সব মৌজায় পাঁচটাই থাকবে না। যেখানে রেকর্ড নেই, সেই জরিপের সারি খালি। খালি সারিকে “জমি নেই” পড়বেন না। পড়বেন “এই জরিপ এই মৌজায় হয়নি বা এখনো ওঠেনি”।
নামজারি এই পাঁচটার কোনোটা নয়। নামজারি পরের মালিকের নাম খোলার আলাদা খাতা। জরিপ থেমে থাকলেও নামজারি চলতে পারে। তাই জরিপের পার্থক্য বোঝার পর নামজারিকে চতুর্থ বা পঞ্চম জরিপ ভেবে মেশাবেন না। সে আলাদা তাক।
জেএল নম্বর জরিপের পরিচয়পত্রের মতো। এক মৌজার সিএস জেএল ২৬ আর আরএস জেএল ২ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। দলিলে জেএল লিখলে পাশে জরিপ না থাকলে আপনি ভুল তাকে হাত দেবেন। খোঁজের সময় জরিপ আগে বাছুন, তারপর জেএল মিলান। উল্টো করলে নাম মিলবে না, আর আপনি মৌজাকে দোষ দেবেন।
সিএস খতিয়ান কীসের ছবি
সিএস মানে ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে। গ্রামের জমি প্রথম বড় আকারে মাপার খাতা। সময়টা ঔপনিবেশিক আমলের শেষ দিক। মালিকের নামে তখনকার জমিদার, প্রজা বা দখলদারের নাম থাকতে পারে। ভাষা পুরনো। বানান এখনকার রীতির সাথে মেলানো কঠিন। দাগ নম্বরও পরে বদলেছে।
সিএস কাজে লাগে যখন আপনি শেকড় দেখতে চান। এই জমি কার নামে প্রথম খাতায় উঠেছিল, পাশের দাগ কারা পেয়েছিল, মৌজার পুরনো কাঠামো কেমন ছিল। বিক্রির দিন সিএস একা যথেষ্ট নয়, কারণ মাঝের সত্তর-আশি বছরে হাত বদল হয়েছে। তবু দাবি যদি বলে “আমরা সিএস থেকে আসছি”, সিএস না দেখে সেই দাবির শুরু মেলানো যায় না।
সিএস পড়তে ধৈর্য লাগে। নাম কাটা, “অন্যান্য” লেখা, বা প্রতিষ্ঠানের নাম থাকতে পারে। এক নাম না পেলে পিতার নাম দিয়ে খুঁজুন। গ্রামের ডাকনাম খতিয়ানে নাও থাকতে পারে। আনুষ্ঠানিক নাম দলিল বা ওয়ারিশ তালিকায় থাকে। সেই নাম নিয়ে খাতা খুলুন।
এসএ খতিয়ান মাঝের সেতু
এসএ স্টেট অ্যাকুইজিশন জরিপ। জমিদারি অধিগ্রহণের পর প্রজাদের নাম সরাসরি খাতায় তোলার সময়। সিএস-এ জমিদারের নাম থাকলে এসএ-তে চাষির নাম উঠতে পারে। এই ফারাক দেখে ভয় পাবেন না। এটাই জরিপের উদ্দেশ্য ছিল।
এসএ সব জেলায় একই গভীরতায় নেই। কোনো মৌজায় এসএ মোটা, কোনোটাতে পাতলা, কোনোটাতে নেই। নেই মানে হারানো নয়। খোঁজের তালিকায় এসএ না এলে অন্য জরিপে যান। এসএ থাকলে সিএস আর আরএস-এর মাঝখানের নাম মেলানো সহজ হয়। দাদা সিএস-এ, বাবা এসএ-তে, ছেলে আরএস-এ, এমন শেকল অনেক পরিবারে আছে।
এসএ-র দাগ সিএস-এর দাগের সাথে হুবহু মিলবে এমন কথা বলব না। মাপের সময় সীমানা ভাঙতে পারে। এক সিএস দাগ দুই এসএ দাগে ভাগ হতে পারে। এই ভাগটা না বুঝলে জমির পরিমাণ নিয়ে ঝগড়া বাধে। পরিমাণ মেলাতে গিয়ে দাগের সংখ্যা গুনবেন না। শতক বা একরের অঙ্ক মেলান, আর কোন দাগ কোন খতিয়ানে আছে সেটা আলাদা কলামে লিখুন।
আরএস খতিয়ান দলিলে সবচেয়ে চেনা
আরএস রিভিশনাল সার্ভে। অনেক জেলায় সাফ-কবলা দলিলে আরএস খতিয়ান আর আরএস দাগই লেখা থাকে। ক্রেতা-বিক্রেতা এই নম্বর দিয়ে কথা বলেন। তাই আরএস ভুল হলে কথাবার্তাই ভুল পথে যায়। আরএস ঠিক মিললেও সিএস উল্টো হতে পারে। দুটোকে এক খাতা ভাববেন না।
আরএস-এর সময় জেলাভেদে আলাদা। কোনো জেলায় কাজ আগে শেষ, কোনোটাতে পরে। “আরএস মানে ১৯৬০” বলে এক বছর সবাইকে চাপিয়ে দেবেন না। আপনার মৌজায় আরএস আছে কি না, খোঁজের জরিপ তালিকা বলে দেবে। আছে মানে সেই খাতা থেকে নাম পড়া যাবে। তারিখের সূক্ষ্ম ইতিহাস ভূমি অফিসের নথি।
আরএস খতিয়ানেও যৌথ নাম থাকে। এক খতিয়ানে কয়েক ভাই। দলিলে এক ভাইয়ের নাম। তখন আরএস পুরো অংশের প্রমাণ নয়। প্রমাণের জন্য পরের হস্তান্তর বা নামজারি লাগে। আরএস আপনাকে বলবে এই নামগুলো একসময় এই দাগে ছিল। এখন কার কত অংশ, সেই অঙ্ক এই পাতায় নাও থাকতে পারে।
বিএস আর বিআরএস নতুন স্তর
বিএস বাংলাদেশ সার্ভে। সব মৌজায় হয়নি। যেখানে হয়েছে, সেখানে আরএস-এর পরের ছবি। নাম আরও চেনা লাগতে পারে, দাগ আবার ভাঙতে পারে। বিএস না থাকলে জোর করে বিএস খুঁজে “রেকর্ড লুকানো” ভাববেন না।
বিআরএস বাংলাদেশ রিভিশনাল সার্ভে আরও নতুন। কাজ চলমান এলাকায় পুরো মৌজা ওঠেনি, এমন হতে পারে। ওঠা অংশ আর না-ওঠা অংশ মিশিয়ে এক সিদ্ধান্ত নেবেন না। খোঁজে বিআরএস এলে সেই জরিপের জেএল ও খতিয়ান আলাদা করে পড়ুন। আরএস নম্বর বিআরএস-এ বসিয়ে নাম আশা করবেন না।
নতুন জরিপ মানে পুরনো জরিপ বাতিল, এমন সরল কথা বলার জায়গা এই গাইড না। মামলা, খাস, বা অধিগ্রহণের প্রশ্নে কোন খাতা ধর্তব্য, সেটা আইনজীবীর ও ভূমি অফিসের বিষয়। আপনার দৈনন্দিন কাজে নতুন জরিপ থাকলে সেটা আগে দেখুন, তারপর পুরনো জরিপ দিয়ে শেকল মেলান। দুটোই রাখুন। একটাকে ফেলে দিন না।
কোন জরিপ এখন হাতে নেবেন
দলিলে যে জরিপ লেখা, খোঁজে সেটাই প্রথম। দলিলে কিছু না থাকলে এলাকায় যা চালু, সাধারণত আরএস বা বিআরএস, সেটা। নাম না মিললে এক ধাপ পুরনো জরিপে যান। নামজারি হয়েছে বলে শুনলে নামজারি খতিয়ান আলাদা দেখুন। এই তিন পদের বেশি লাফালাফি করবেন না। লাফালে আপনি নিজেই গুলিয়ে ফেলবেন।
এক মৌজায় একাধিক জরিপ থাকলে দাম তিনবার কল্পনা করবেন না। প্রতিটি জরিপের বই আলাদা পণ্যের মতো। সিএস বই আর আরএস বই এক ফাইল নয়। দরকার দুটো হলে দুটোই দেখুন। দরকার একটা হলে একটাই নিন। “যেকোনো একটা হলেই হয়” এমন কথা জরিপের ক্ষেত্রে মিথ্যা।
জরিপ বাছার সময় মৌজার খতিয়ান সংখ্যা দেখুন। অস্বাভাবিক কম বা বেশি হলে জরিপ উল্টে গেছে কি না ভাবুন। সংখ্যা না এলে সংখ্যাকে শূন্য ধরবেন না। সেদিন গণনা আসেনি। আরেকবার দেখুন, অথবা নম্বর দিয়ে সরাসরি একক খতিয়ান খুলুন।
নামজারির সাথে জরিপের ফারাক
জরিপ একটা সময়ের ক্যাম্প। সার্ভেয়ার এসে মৌজা মাপে, খতিয়ান লেখে, কাজ শেষ করে চলে যায়। নামজারি এরপরও চলে। বাবা মারা গেলে, জমি বিক্রি হলে, আদালতের আদেশ হলে নামজারি খতিয়ান খুলতে পারে। জরিপের খাতায় পুরনো নাম থেকে যেতে পারে। নামজারিতে নতুন নাম। দুটোই সত্যি, দুই সময়ের।
তাই “আরএস-এ আমার নাম নেই” শুনেই জমি খারিজ করবেন না। জিজ্ঞেস করুন নামজারি খতিয়ান নম্বর কত। সেই নম্বর নিয়ে নামজারি তালিকা দেখুন। উল্টো করে, নামজারিতে নাম আছে দেখে জরিপের দাগ না মেলালেও চলবে না। দাগ জরিপে একরকম, নামজারিতে আরেকরকম হতে পারে। দাগের শেকল আলাদা গাইডের কাজ।
নামজারি খতিয়ান বই জরিপের বইয়ের বদলি নয়। দুটোর দাম, ভিতরের নাম, আর ব্যবহার আলাদা। একটা কিনে আরেকটার কাজ আশা করলে টাকা বৃথা যায়। যাচাইয়ের নোটে লিখুন কোন নাম কোন খাতায়। এক কলামে জরিপ, আরেক কলামে নামজারি।
পড়ার সময় যে নিয়ম মানা ভালো
এক জরিপ শেষ না করে আরেক জরিপের স্ক্রিনশট মেশাবেন না। ফাইলের নামে জরিপ লিখে রাখুন। “খতিয়ান.পিডিএফ” এই নামে তিনটে জরিপ রাখলে সন্ধ্যায় আপনি নিজেই ভুল ফাইল পাঠাবেন। নাম হোক মৌজা, জেএল, জরিপ, খতিয়ান নম্বর। লম্বা নাম বিরক্তিকর, কিন্তু সস্তা।
পরিবারের বড়দের মুখের নাম আর খাতার নাম আলাদা হতে পারে। খাতার বানানই যাচাইয়ের বানান। মুখের নাম নোটের পাশে বন্ধনীতে রাখুন। খাতায় ঢোকাবেন না। ঢোকালে খোঁজ ফেল হবে।
সবশেষে মনে রাখুন, এই সাইটের বই তথ্যের বই। সরকারি সার্টিফাইড কপি নয়, মামলার প্রমাণ হিসেবে জমা দেওয়ার কাগজ নয়। জরিপের পার্থক্য বুঝে আপনি সঠিক খাতা খুলতে পারবেন। খাতা খুলে নাম মিলিয়ে তারপর অফিসের আসল কাগজের পথে যাবেন। পার্থক্য জানাটা সেই পথের প্রথম বাঁক। বাঁক না নিলে সোজা রাস্তাও আপনাকে ভুল মৌজায় নামিয়ে দেয়।
খাতা বন্ধ করার আগে একবার চেকলিস্ট পড়ুন। দলিলের জরিপের নাম লিখেছেন। সেই জরিপের জেএল মিলিয়েছেন। খতিয়ান নম্বর সেই জরিপের। নাম ও পিতার নাম পড়েছেন। দাগের তালিকা থেকে আপনার দাগ আলাদা করেছেন। নামজারি লাগলে সেটা আলাদা খাতায় রেখেছেন। এই ছয়টা না হলে জরিপের পার্থক্য আপনি জেনেছেন, কিন্তু আপনার ফাইলে সেটা নামেনি। জানা আর নামানো আলাদা। নামালে পরের মানুষ এক মিনিটে বুঝবে আপনি কোন খাতা দেখেছেন। না নামালে সে আবার সিএস খুলে আরএস খুঁজবে, আর পুরো গাইড বৃথা যাবে।
আরও পড়ুন
আপনার মৌজা খুঁজুন
বিভাগ থেকে মৌজা বেছে খতিয়ান বই, দাগ বই বা দুটো একসাথে — দাম এই খোঁজেই দেখা যায়।
আগে বিভাগ বেছে নিন
আগে জেলা বেছে নিন
আগে উপজেলা বেছে নিন
আগে জরিপ বেছে নিন